ফজরের নামাজের গুরুত্ব

দুনিয়ায় যতো ভর্ৎসনা-প্রকাশক শব্দ আছে, এর মধ্যে জঘন্যতম অভিব্যক্তির একটা তালিকা যদি করা হয়, তাহলে নিশ্চিত ‘মুনাফিক’ শব্দটা প্রথমদিকেই থাকবে। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করার চিন্তা করি, কেউ যদি আমাকে ‘মুনাফিক কোথাকার!’ বলে, আমার কেমন অনুভূতি হয়! অথবা আমি যদি কাউকে ‘মুনাফিক’ বলে সম্বোধন করি, তাহলে কী বিপুল তেজ ও ক্রোধ নিয়ে সে আমার দিকে তেড়ে আসবে? এর কারণ কী? কারণ হোল, মুনাফিকি একটি ঘৃণিত চরিত্র, গর্ব করার মতো কোনো বিষয় নয়।
.
কিন্তু… এই ‘মুনাফিক’ অভিধার তিলক যদি আমি নিজেই আমার কপালে পরে নেই, তাহলে কার কী করার আছে? আবারো আবূ হুরায়রার কাছে যাই। তিনি আমাদেরকে শোনাচ্ছেন আল্লাহর রাসূলের ( ﷺ ) একটা উক্তি:
ﻟﻴﺲ ﺻﻼﺓ ﺃﺛﻘﻞ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻤﻨﺎﻓﻖ ﻣﻦ ﺍﻟﻔﺠﺮ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ

“ফজর ও ইশার চেয়ে মুনাফিকের জন্যে কঠিন কোনো সালাত নেই”
[বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবন মাজাহ]

আমি মুনাফিক নই ঠিক, কিন্তু মুনাফিকের মতো কাজই তো করলাম ফজর ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে।
হায়, দিন দিন কত নিচে নেমে যাচ্ছি!
কত নীচ হয়ে যাচ্ছি!
.
আমি নিজেকে বলি,
উপুড় হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার মতো পাপিষ্ঠ তাহলে আমি?
শাইত্বানের স্রাব প্রস্রবণের স্থান হবার মতো নীচ কি আমি?
মুনাফিকের মতো ঘৃণিত অভিধায় অভিহিত হবার মত কি অধম আমি?
আল্লাহর কাছ থেকে নিন্দিত হবার মতো হতভাগা হয়ে উঠার কথা কি আমার ছিলো?
ছিলো না।
.
আমি এই নীচতা থেকে পরিত্রাণ চাই।
আমি এই হীনতা থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে চাই।
শাইত্বানের অনুগামী হওয়ার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে চাই।
আমি আমার প্রিয়তম প্রভূর কাছে প্রশংসিত হতে চাই।

ফজরের নামাজের গুরুত্ব

সিদ্ধান্ত নেই, ফজর সালাত ত্যাগ করবো না কখনোই। ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু আযানের পর আবারো তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। নবীজির ( ﷺ ) সাহাবী সামুরাহ ইবন জুনদুব (রা)-কে স্বপ্নে দেখি। তিনি আমার পাশে এসে বসলেন। মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন, ‘তোমাকে স্বপ্নের মধ্যেই একটা স্বপ্নের গল্প বলি’। আমি তো গল্প পছন্দ করি খুব। সোৎসাহে বললাম, ‘বলুন না প্লিজ!’ তিনি গল্প শুরু করার আগে বললেন, ‘এই যে স্বপ্নটা, এটা কিন্তু যেনতেন স্বপ্ন নয়। তোমাকে যে স্বপ্নের গল্প করছি, এটা নবীজি ( ﷺ ) দেখেছিলেন!’ আমি আরো উৎসুক হলাম। তিনি গল্পটা শোনাতে লাগলেন। যখনই বললেন:
ﺃﻣﺎ ﺍﻟﺬﻱ ﻳﺜﻠﻎ ﺭﺃﺳﻪ ﺑﺎﻟﺤﺠﺮ ﻓﺈﻧﻪ ﻳﺄﺧﺬ ﺍﻟﻘﺮﺁﻥ ﻓﻴﺮﻓﻀﻪ ﻭﻳﻨﺎﻡ ﻋﻦ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺍﻟﻤﻜﺘﻮﺑﺔ

“যে ব্যক্তির মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ করে দেয়া হচ্ছিলো, সে হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে কুরআনকে নেয় ও প্রত্যাখ্যান করে এবং ফরয সালাত রেখে ঘুমিয়ে থাকে।”
[সাহীহ বুখারী]

আমি প্রচণ্ডভাবে ঘেমে যাচ্ছিলাম। ধড়পড় করে উঠে পড়লাম বিছানা থেকে। ততক্ষণে ফজরের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাড়াহুড়ো করে দুই রাকাত ফরয আদায় করে নিলাম। কিন্তু মনটা কেমন উদাস হয়ে থাকলো। কিছুতেই স্থির হতে পারছিলাম না। কিসের যেন শূন্যতাবোধ আমাকে গ্রাস করছিলো। একে তো জামা‘আতের সাথে পড়ি নি; আবার দুই রাকাত সুন্নাতও বাদ দিয়েছি। এই দুই রাকাত সুন্নাতের ব্যাপারে আমাদের নবীজি ( ﷺ ) বলেছিলেন:
ﺭﻛﻌﺘﺎ ﺍﻟﻔﺠﺮ ﺧﻴﺮ ﻣﻦ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ ﻭﻣﺎ ﻓﻴﻬﺎ

“পৃথিবী এবং পৃথিবীর মধ্যবর্তী যা কিছু আছে, তারচেয়ে বেশি উত্তম ফজরের দুই রাকাত (সুন্নাত) সালাত।”
[মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ]

জায়নামাযে বসে বসে আরেকটা ভাবনার সৃষ্টি হোল। আচ্ছা, ফজরের দুই রাকাত সুন্নাতের মূল্য যদি এত বেশি হয়ে থাকে, তাহলে ফরজ দুই রাকাতের মূল্য ও মর্যাদা কত বেশি হতে পারে!

আধা ঘণ্টা বেশি ঘুমানোর জন্যে আমি প্রতিদিন এত বড়ো সম্মান ও মর্যাদাকর উপলক্ষকে হাতছাড়া করে চলছি! কী বোকা আমি! আমাকে কি আমি ধিক্কার দেবো? না, তা দিয়ে লাভ নেই। বরং আর দেরি না করে সৌভাগ্যবানদের কাতারে নিজেকে শামিল করে ফেলতে স্থিতধী হয়ে যাই।
.
এরপর থেকে আমি ফজরের সালাতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করি। বিছানার পেলবতা আমাকে আর পুরনো গর্তে ফেলতে পারে না। ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম’ আমার কানে অপার্থিব সুরের মূর্ছনা নিয়ে আসে। কী এক তন্ময়তার ঘোর আমাকে পেয়ে বসে!

আমি ধীর পদক্ষেপে মাসজিদের দিকে পা বাড়াই। পৃথিবীর কোল থেকে রাত্রি তখনো পুরোপুরি নামে নি। আবছা অন্ধকারের বুক চিরে আমার কদম অগ্রসর হয়। কেমন একটা তৃপ্তির রেশ আমার ‘সুপ্তি-মগন’কে আলতো ছোঁয়ায় জাগাতে থাকে। এই তৃপ্তিবোধের উৎস কোথায়? উৎস তো অনেক! তোমাকে কোনটা বলি? একটা উৎস হতে পারে এই হাদিস:
ﻣﻦ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﻓﻲ ﺟﻤﺎﻋﺔ ﻓﻜﺄﻧﻤﺎ ﻗﺎﻡ ﻧﺼﻒ ﺍﻟﻠﻴﻞ ﻭﻣﻦ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﺼﺒﺢ ﻓﻲ ﺟﻤﺎﻋﺔ ﻓﻜﺄﻧﻤﺎ ﻗﺎﻡ ﺍﻟﻠﻴﻞ ﻛﻠﻪ
“জামা‘আত সহকারে যে ‘ইশা আদায় করলো, সে যেনো অর্ধরাত্রি ধরে (নফল) সালাত আদায় করলো; এবং জামা‘আত সহকারে যে ফজর আদায় করলো, সে যেনো সারা রাত ধরে (নফল) সালাত আদায় করলো।”
[সাহীহ মুসলিম, মুসনাদ আহমাদ]

ফজরের নামাজের গুরুত্ব সম্পকে জেনে আপনার কি অভিমত।

এমন ইসলামিক তথ্য পড়ুন shikkharalo.com

‍এই পোস্টটি ইংরেজি ভাষায় পড়তে পারেন listenthestory.com